নজিরবিহীন ভোট ডাকাতির নির্বাচন

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ প্রযোজনায় জালিয়াতির ভোট গ্রহণ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দলটির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, এটা নজিরবিহীন ভোট ডাকাতির ও সন্ত্রাসের নির্বাচন। সেইসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্র হত্যাকারী ঘাতক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বুধবার দুপুরে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন। এর আগে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে একগুচ্ছ অভিযোগ করেন। এদিন সকাল ৮টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে শেষ হয় বিকাল ৪টায়।

রিজভী বলেন, আমরা ভোটের তিন ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত চিত্র নির্বাচনি কমিশনকে দিয়েছি। এটা নজিরবিহীন নির্বাচন। দিনের ভোট রাতে হয়। তিনি বলেন, নির্বাচনে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। ভোটাররা ভোট দিতে পারছেন না।

বুধবারদুজন মারা গেছেন, এটা সহিংসতার নির্বাচন। তাহলে এ দেশে শান্তিপূর্ণ ভোটের কথা বলে তার দৃষ্টান্ত এই দু-তিন ঘণ্টার মধ্যে ঘটেছে। সিটি নির্বাচন এলাকায় চরম সহিংস পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

রিজভী বলেন, এ নির্বাচন চূড়ান্ত পর্যায়ের তামাশা। প্রহসনের নির্বাচন। এ সরকারের বাকি সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচন অচেনা হয়ে যাবে। সিইসিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এ দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্রকে হত্যাকারী ঘাতক হচ্ছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। হুকুমের আসামি সরকারপ্রধান।

এ সময় রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে ছিলেন আরেক যুগ্মমহাসচিব ও বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর শরাফত আলী সপু প্রমুখ।

নির্বাচনের নামে ভোট ডাকাতি হয়েছে : ডা. শাহাদাত

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, নির্বাচনের নামে প্রহসন, নির্যাতন ও ভোট ডাকাতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। চসিক নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও ভোট ডাকাতির ইতিহাস উন্মোচিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল। আমরা মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। কিন্তু নির্বাচনটা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের হয়নি, হয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশাসনযন্ত্রের সঙ্গে। বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে আমরা স্পষ্ট দেখেছি, আমাদের এজেন্ট ও ভোটাররা প্রশাসনের কাছে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় ছিল।

ডা. শাহাদাত আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের একটি অংশ হচ্ছে পোলিং এজেন্ট। কিন্তু তারা নির্বাচন কমিশন কিংবা প্রশাসন কারও কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পায়নি। হাজার হাজার বহিরাগত ভোট কেন্দ্রের গেটে অবস্থান করেছে। ভেতরেও ছিল। তারা বিএনপির এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়নি। যারা কেন্দ্রে প্রবেশ করেছিল তাদের বের করে দিয়েছে। শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। আমি নিজে বাকলিয়া বিএড কলেজ কেন্দ্রে দেখেছি, অনেক মহিলা ভোটার ও এজেন্ট কান্না করছে। অনেক নারী এজেন্ট বলেছে, তাদের স্পর্শকাতর অঙ্গে হাত দেওয়া হয়েছে। বহিরাগতদের কেন্দ্র দখলের অভিযোগ এনে শাহাদাত বলেন, এত বেশি বহিরাগত কেন্দ্রে অবস্থান করছিল যে ভোটাররা কেন্দ্রে যাওয়ার সাহস পায়নি।

ইভিএম ব্যালট প্যানেলকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়নি এমন অভিযোগ তুলে শাহাদাত বলেন, আমরা রিটার্নিং অফিসারের কাছে নির্বাচনের আগেই ব্যালট প্যানেল সুরক্ষার দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এনআইডি কার্ড ছাড়া লোক ঢুকেছে। আড়াইটার দিকে রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে দেখা করেছি। নির্বাচনে আসার তিনটি শর্ত- ব্যালট পেপারকে সুরক্ষা দেওয়া, এনআইডি কার্ড ছাড়া লোক প্রবেশ না করানো, বহিরাগতরা কেন্দ্রের বাইরে যাতে না থাকে তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। তিনি কোনোটাই পূরণ করেননি। অথচ নির্বাচনের আগে এসব দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন। ব্যালট প্যানেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো লোক ছিল না। রিটার্নিং অফিসার এখন বলছেন, এটার নাকি নিয়ম নেই। তাহলে তিনি আগে কেন এটা বলেননি। কেন তিনি আমাদের আগে আশ্বস্ত করেছিলেন।

ব্যালটের মতো ইভিএমে রাতে ভোট হয়েছে : আমীর খসর মাহমুদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী ও দলীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ৭৩৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫০০টিরও বেশি কেন্দ্র দখল করে নেয়। নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে নেতাকর্মীদের ওপর। প্রতিটি কেন্দ্র বহিরাগত এনে দখল করা হয়েছে। খোলাখুলি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দেওয়া হয়েছে মহড়া। যেখানে সাধারণ মানুষ ও ভোটারদের চাপে আওয়ামী লীগ কেন্দ্র দখল করতে পারেনি, সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দখল করে দিয়েছে।

আমীর খসরু আরও বলেন, বর্তমান সরকার চট্টগ্রাম নগরবাসীকে আবারও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। ভোট ডাকাতি করা বা চুরি করা এক ব্যাপার। নির্বাচনের নামে নেতাকর্মী ও ভোটারদের যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে তা নজিরবিহীন। ঘর থেকে বের করে দিয়ে, বাড়িঘরে হামলা করে, মারধর করে একটি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়। এরপর আর কোনো নির্বাচন থাকে না। এমন নির্বাচনের কোনো প্রয়োজন নেই। দেশে আর কোনো নির্বাচন হবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।

ব্যালট পেপারের মতো ইভিএম মেশিনেও আগের রাতে ভোট দেওয়া হয়েছে দাবি করে বিএনপির এই নেতা বলেন, মক ভোটিংয়ের নামে নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়া হয়েছে। পরে ভোটের দিন সেই চিপগুলো ব্যবহার করেছে। আমরা মনে করতাম আওয়ামী লীগ আগে রাতে ব্যালট পেপার চুরি করে। এবার তারা নতুন ধারা চালু করেছে। ইভিএমও চুরি করেছে। কয়েকটি কেন্দ্রে তারা আগের রাতে জোর করে ঢুকে প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারের মাধ্যমে অনেক ভোট ঢুকিয়েছে। দিনের বেলায় ভোটারের আঙুলের ছাপ নিয়ে বের করে দিয়ে বাকি কাজটুকু তারা সেরেছে। এটা সব জায়গায় হয়েছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে ইভিএমে ধানের শীষের প্রতীকই ছিল না। কিছু কিছু কেন্দ্রে ধানের শীষ চাপলে আম মার্কা চলে এসেছে। ধানের শীষের বাটন নষ্ট ছিল কোথাও কোথাও। এ হচ্ছে ইভিএম। পুরোপুরি ইভিএমের অপব্যবহার করেছে।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনে কতগুলো তাঁবেদারকে বসানো হয়েছে ভোট চুরি ও ডাকাতির জন্য। সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে লাভ নেই। অনির্বাচিত অবৈধ সরকার তাদের মাধ্যমে ভোট ডাকাতি করছে। তাই এই অবৈধ সরকারকে যেতে হবে। তাদেরকে পদত্যাগ করতে হবে। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে দেশে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা স্থানীয় সরকার গঠন করতে হবে।

JUGANTOR

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *